Articles › Case Law
রাষ্ট্রপতির অবর্তমানে স্পিকারের আইনগত মর্যাদা: 'অ্যাক্টিং প্রেসিডেন্ট' নাকি 'প্রেসিডেন্ট-ইন-চার্জ'?
রাষ্ট্রপতির অনুপস্থিতিতে স্পিকার কি 'অ্যাক্টিং প্রেসিডেন্ট' নাকি 'প্রেসিডেন্ট-ইন-চার্জ'? বাংলাদেশ সংবিধানের ৫৪ ও ৭৪ অনুচ্ছেদের আলোকে তুলনামূলক সাংবিধানিক বিশ্লেষণ।
Md. Mostasin Billah ·
রাষ্ট্রপতির অবর্তমানে স্পিকারের আইনগত মর্যাদা: ‘অ্যাক্টিং প্রেসিডেন্ট’ নাকি ‘প্রেসিডেন্ট-ইন-চার্জ’?
১. প্রাসঙ্গিকতা ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
সংবিধানের বিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির অসুস্থতা বা অনুপস্থিতির কারণে স্পিকারকে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করতে হয়। কিন্তু দায়িত্ব পালনকালে তাঁর আনুষ্ঠানিক পদবি কী হবে, তা নিয়ে বাংলাদেশের সাংবিধানিক ইতিহাসে বিতর্ক রয়েছে।
এই বিধানটি ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে ২০০৬ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের শাসনমালে। ২০০৬ সালের ২৪ মে ৭৫ বছর বয়সী রাষ্ট্রপতি চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে গেলে, তাঁর অনুপস্থিতিতে তৎকালীন স্পিকার ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। সে সময় স্পিকারের পদবি "অ্যাক্টিং প্রেসিডেন্ট" (Acting President) হবে নাকি নিছকই "প্রেসিডেন্ট-ইন-চার্জ" (President-in-charge) হবে, তা নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি হয়। সে সময় বঙ্গভবনের একজন মুখপাত্র গণমাধ্যমকে তাঁকে "অ্যাক্টিং প্রেসিডেন্ট" হিসেবে সম্বোধন করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। [রেফা: UNB, ১ জুন, ২০০৯ ]
২. ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানের বিধান (The Original Constitution)
১৯৭২ সালের মূল সংবিধানে স্পিকারকে প্রত্যক্ষভাবে "অ্যাক্টিং প্রেসিডেন্ট" মর্যাদা দেওয়া হয়নি। মূল সংবিধান অনুযায়ী:
৫৪ অনুচ্ছেদটি 'রাষ্ট্রপতির অনুপস্থিতি ইত্যাদিতে স্পিকারের রাষ্ট্রপতি হিসেবে কাজ করা' শিরোনামে যুক্ত করা হয়েছিল। অনুচ্ছেদটির ভাষায় বলা হয়েছিল-- রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে বা অনুপস্থিতি, অসুস্থতা বা অন্য কোনো কারণে রাষ্ট্রপতি তাঁর পদের দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হলে, নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত বা রাষ্ট্রপতি পুনরায় তাঁর দায়িত্বভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত স্পিকার কেবল সেই দায়িত্বগুলো পালন করবেন (shall discharge those functions)। [রেফা: অনুচ্ছেদ ৫৪]
১৫২ অনুচ্ছেদে "রাষ্ট্রপতি" পদের সংজ্ঞায় বলা হয়, সংবিধানের অধীনে নির্বাচিত বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি অথবা আপাতত ওই পদে ভারপ্রাপ্ত হিসেবে (acting in that office) দায়িত্ব পালনকারী কোনো ব্যক্তি। [রেফা: অনুচ্ছেদ ১৫২]
সুতরাং, মূল সংবিধানের আইনি কাঠামো স্পিকারকে "অ্যাক্টিং প্রেসিডেন্ট" মর্যাদা দেয়নি, বরং তাঁকে একজন "প্রেসিডেন্ট-ইন-চার্জ" হিসেবেই বিবেচনা করেছিল, যিনি কেবল রাষ্ট্রপতির কার্যভার পালন করছিলেন।
৩. চতুর্থ সংশোধনীর প্রভাব (After the Fourth Amendment)
চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে এবং রাষ্ট্রপতি সংক্রান্ত ১নং পরিচ্ছেদটি 'পরিচ্ছেদ ১ -- রাষ্ট্রপতি এবং উপ-রাষ্ট্রপতি' নামে প্রতিস্থাপিত হয়।
এই সংশোধনীতে ৫৫ অনুচ্ছেদটি 'অ্যাক্টিং প্রেসিডেন্ট' শিরোনামে যুক্ত করা হয়। এতে স্পষ্ট বলা হয়, রাষ্ট্রপতি ও উপ-রাষ্ট্রপতি উভয়েই দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হলে, স্পিকার রাষ্ট্রপতি হিসেবে কাজ করবেন (shall act as President)। [রেফা: চতুর্থ সংশোধনী, অনুচ্ছেদ ৫৫]
একই সাথে ৭৪(৩) অনুচ্ছেদটি সংশোধন করে বলা হয়: "স্পিকার যখন রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছেন (acting as President)..."। [রেফা: অনুচ্ছেদ ৭৪(৩)]
অর্থাৎ, চতুর্থ সংশোধনী অনুযায়ী স্পিকারকে আইনত "অ্যাক্টিং প্রেসিডেন্ট" বা ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বলার সুস্পষ্ট সুযোগ তৈরি হয়েছিল।
৪. দ্বাদশ ও পঞ্চদশ সংশোধনী এবং বর্তমান সাংবিধানিক অস্পষ্টতা
দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে পূর্ববর্তী ৫৫ অনুচ্ছেদটি বাতিল করে মূল ৫৪ অনুচ্ছেদটি পুনরায় বহাল করা হয়। ফলে, স্পিকারের "অ্যাক্টিং প্রেসিডেন্ট" মর্যাদা আবার বিলুপ্ত হয়। কিন্তু আইনি জটিলতা তৈরি হয় অন্য জায়গায়:
দ্বাদশ সংশোধনীতে ৭৪(৩) অনুচ্ছেদটি তার পূর্ববর্তী (মূল) রূপে পুরোপুরি ফিরে যায়নি। সেখানে এখনো উল্লেখ রয়ে যায়-- "স্পিকার যখন রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছেন (acting as President)..."।
পরবর্তীতে পঞ্চদশ সংশোধনী, যা মূল সংবিধানের অনেক বিধান ফিরিয়ে এনেছে, সেটিও এই ৭৪(৩) অনুচ্ছেদে কোনো পরিবর্তন আনেনি।
এর ফলে একটি সাংবিধানিক অস্পষ্টতা রয়ে যায় যে স্পিকার কি আসলে "অ্যাক্টিং প্রেসিডেন্ট" নাকি "প্রেসিডেন্ট-ইন-চার্জ"।
আমার মতে, সংবিধানের দুটি অনুচ্ছেদের মধ্যে এই ভাষা-গত পার্থক্যের কারণে সাংবিধানিক ব্যাখ্যার সাধারণ নীতি প্রয়োগ করতে হয়। আইনি নীতি অনুযায়ী, কোনো ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে মূল ক্ষমতাপ্রদানকারী অনুচ্ছেদ বা 'Enabling Article'-কে সবসময় প্রাধান্য দিতে হয়। যেহেতু স্পিকারকে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনের ক্ষমতা প্রদানকারী মূল অনুচ্ছেদ হলো ৫৪ অনুচ্ছেদ (এবং ৭৪ অনুচ্ছেদ মূলত স্পিকারের পদের শূন্যতা সংক্রান্ত), তাই ৫৪ অনুচ্ছেদের আলোকেই স্পিকারের পদবি নির্ধারণ করা আইনত অধিকতর যুক্তিযুক্ত। [রেফা: মো. নজমুজ্জামান ভূঁইয়া, 'Speaker Acting as President: No Constitutional Controversy', দ্য ডেইলি স্টার, ল অ্যান্ড আওয়ার রাইটস, ১ জুলাই, ২০০৬ ]
উপরিউক্ত ব্যাখ্যার আলোকে, বর্তমান স্পিকার যদি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তবে ৫৪ অনুচ্ছেদের সাংবিধানিক ম্যান্ডেট অনুযায়ী তাঁকে "প্রেসিডেন্ট-ইন-চার্জ" (President-in-charge) বলাই সঠিক হবে, "অ্যাক্টিং প্রেসিডেন্ট" নয়।
এছাড়াও অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে বা তিনি দায়িত্ব পালনে অক্ষম হলে কে এবং কোন পরিচয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন, তার সুনির্দিষ্ট নজির রয়েছে।
১. Indian Constitution:
ভারতের সংবিধানের ৬৫ অনুচ্ছেদে Vice-President দায়িত্ব গ্রহণের কথা বলা হয়েছে।
অ্যাক্টিং প্রেসিডেন্ট: রাষ্ট্রপতির মৃত্যু, পদত্যাগ বা অপসারণের কারণে পদ শূন্য হলে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত উপ-রাষ্ট্রপতি 'রাষ্ট্রপতি হিসেবে কাজ করবেন' (shall act as President)।
দায়িত্ব পালন (Discharging Functions): কিন্তু রাষ্ট্রপতি যদি অসুস্থতা বা অন্য কোনো কারণে অনুপস্থিত থাকেন, তবে উপ-রাষ্ট্রপতি কেবল তাঁর 'দায়িত্ব পালন করবেন' (discharge his functions)।
The President (Discharge of Functions) Act, 1969: ভারতে যখন রাষ্ট্রপতি এবং উপ-রাষ্ট্রপতি উভয়ের পদ শূন্য হয়, তখন ভারতের প্রধান বিচারপতি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৯ সালে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এম. হিদায়াতুল্লাহ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন। আইনের ভাষায় তিনি 'অ্যাক্টিং প্রেসিডেন্ট' ছিলেন না, তিনি ছিলেন এমন একজন ব্যক্তি যিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছিলেন (Discharging the functions of the President), যা আমাদের ৫৪ অনুচ্ছেদের সাথে সরাসরি সাদৃশ্যপূর্ণ।
২. US Constitution & 25th Amendment:
মার্কিন সংবিধানে এই বিষয়টি অত্যন্ত সুস্পষ্ট। মার্কিন সংবিধানের ২৫তম সংশোধনী (25th Amendment) অনুযায়ী:
রাষ্ট্রপতির মৃত্যু বা পদত্যাগের ক্ষেত্রে উপ-রাষ্ট্রপতি সরাসরি 'রাষ্ট্রপতি' হয়ে যান। (যাকে 'Tyler Precedent' বলা হয়, যা জন টাইলার ১৮৪১ সালে স্থাপন করেছিলেন)।
তবে রাষ্ট্রপতি যদি লিখিতভাবে জানান যে তিনি সাময়িকভাবে দায়িত্ব পালনে অক্ষম (যেমন: কোনো সার্জারির সময়), তখন উপ-রাষ্ট্রপতি সংবিধিবদ্ধভাবেই "অ্যাক্টিং প্রেসিডেন্ট" উপাধি গ্রহণ করেন। যেমন, ২০২১ সালে জো বাইডেনের একটি মেডিকেল প্রসিডিউরের সময় কমলা হ্যারিস সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে 'Acting President' ছিলেন। যেহেতু তাদের সংবিধানে এটি স্পষ্ট লেখা আছে, তাই সেখানে কোনো অস্পষ্টতা নেই।
৩. Constitution of Pakistan:
পাকিস্তানের সংবিধানের ৪৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে বা তিনি অসুস্থ থাকলে সিনেটের চেয়ারম্যান রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। সেখানেও ভারতের মতোই বিভাজন করা হয়েছে: পদ স্থায়ীভাবে শূন্য হলে তিনি "act as President" (রাষ্ট্রপতি হিসেবে কাজ করেন), আর সাময়িক অনুপস্থিতি হলে তিনি "perform the functions of President" (রাষ্ট্রপতির কার্যাবলি সম্পাদন করেন)।
তুলনামূলক আলোচনা থেকে এটি স্পষ্ট যে, যখন কোনো সংবিধানে সাময়িকভাবে দায়িত্ব পালনের কথা বলা হয় (যেমন ৫৪ অনুচ্ছেদ), তখন আন্তর্জাতিক সাংবিধানিক চর্চায় তাকে 'অ্যাক্টিং প্রেসিডেন্ট' না বলে 'প্রেসিডেন্ট-ইন-চার্জ' বা 'দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি' হিসেবেই গণ্য করা হয়। 'অ্যাক্টিং প্রেসিডেন্ট' হতে হলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ২৫তম সংশোধনীর মতো বা বাংলাদেশের চতুর্থ সংশোধনীর (যা বর্তমানে বাতিল) মতো সংবিধানে সুস্পষ্টভাবে পদবির উল্লেখ থাকতে হয়।